,


সংবাদ শিরোনাম:
«» চেয়ারম্যান-মেম্বার নয়; সেনা-নৌ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দ বিতরণ চায় মানুষ «» নবীগঞ্জ উপজেলায় সরকারি বরাদ্দকৃত খাদ্য সামগ্রী বিতরণ শুরু করলেন- বিশ্বজিত কুমার পাল «» জগন্নাথপুর জনতাকে সচেতন করতে পুলিশের মাইকিং «» ওসি আহাদের বৃত্তাঙ্কনের সেবা নিচ্ছে গোয়াইনঘাটের জনগণ «» যশোর মণিরামপুরে এসিল্যান্ড দু’বৃদ্ধকে কানধরে উঠবস করালেন «» সিলেটে ঘরে বসে সরকারি খাদ্য সামগ্রী পাচ্ছে ১৫ শতাধিক পরিবার «» বাংলাদেশ নৌবাহিনীর”খুলনা অঞ্চলে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম” «» করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ «» এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মামলা করবেন ব্যারিস্টার সুমন «» আয়ের পথ বন্ধ, গোলাপগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ

‘শেকড়’,কাজী আব্দুল হালিম সানী

শেকড়

                                                                লেখকঃ- কাজী আব্দুল হালিম সানী

রফিক সাহেব চা খাচ্ছেন। পরপর তিন কাপ চা খেলেন। এটা উনার ছোট বেলার অভ্যাস।  চা মজা হলে ৬-৭ কাপ খান আর খারাপ হলে ২/৩ কাপ। আজ ভালো হয় নি। আজ তার অফিসে যেতেও একদম ইচ্ছা করছে না,  কিন্তু যেতে হবেই। তিনি ভাবছেন আজকে রাতে সবাই বাইরে খাবেন। পরিবারকে সময় দিলে ভালোবাসা দৃঢ় হয়। কিছু ভালোবাসায় জং ধরে যায়, তা এইভাবেই পরিষ্কার করতে হয়।
” এই শুনো, আমি এক কথা এক’শ বার বলতে পারবো না। তোমার ছেলেকে কোথাও পাঠিয়ে দাও। আমার ছেলেটাও এখন তোমার ছেলের মতো হয়ে যাচ্ছে। আমার ছেলেতো এমন ছিল না।”
রফিক – ” আমার ছেলে,  আমার ছেলে বলছো কেনো ও তো তোমারও ছেলে, তাই না?”
কেয়া – ” না ওই অটিস্টিক ছেলে আমার না।  সারাক্ষণ পাগলের মতো জ্বালাতে শুরু করে। এই ছেলে তোমার,  আমার না। আর আমার ছেলে থেকে দূরে রাখো। কোনো ব্যবস্থা কি নিবে?”
রফিক সাহেব কোনো কথা বললেন না। অযথাই হাতের পরিষ্কার ঘরিটা আবার পরিষ্কার করলেন।
কেয়া – ” বুঝেছি আমায় কিছু একটা করতে হবে।  বাবাকে বলবো। পরে কিন্তু কান্না কাটি করে কোনো লাভ নেই। আমি বাবার মতোই স্ট্রেট ফরওয়ার্ড।”
রফিক সাহেব চলে গেলেন অফিসে।
রনি – ” মা, ও মা কোথায় তুমি?”
কেয়া – ” আয়, বাবা। কত্ত পরিশ্রম করলি স্কুলে,  আয়।”
রাজু – ” আমি আসি মা?”
কেয়া – “না, তুই আসবি না।”
রনি – ” কেনো আসবে না,  মা? ভাইয়াও তো স্কুলে গিয়েছে পরিশ্রম করেছে। আর সে তো আমার ভাই তোমার ছেলে আসবেই। আসো ভাইয়া।”
কেয়া – ” না আসবি না, খবরদার। যা দূরে যা। পাগল একটা, আমার ছেলেটাকে পাগল বানিয়ে ফেলেছিস।”
রনি – ” মা, খবরদার! আমার ভাইকে তুমি পাগল বলবে না। সে আমার ভাই। আমার ভাই আমার মতো।  সে পাগল না। যে বলবে সে পাগল। ভাইয়া না আসলে আমিও আসবো না, চলো ভাইয়া।”
দুই ভাই তাদের রুমে চলে গেলো। রনির মা দাড়িয়ে দাড়িয়ে এই দৃশ্য দেখলেন।
রনি – ” ভাইয়া, তুমি মন খারাপ করো না। “
রাজু – ” ভাইয়া, আমি কি পাগল?”
রনি – ” না ভাইয়া। তুমি পাগল না। তুমিতো সব বুঝো পাগল রা তো সব বুঝে না। যে তোমাকে পাগল বলবে তার চোখ তুলে ফেলবো আমি।”
রাজু – ” তোমার মা যে বললো।”
রনি – ” ভাইয়া, তোমার মা বলছো কেনো। উনি তো তোমারও মা। আর মায়ের মাথায় মনে হয় কিছু সমস্যা আছে তাই এমন বলে।”
রাজু – ” ভাইয়া আমি কি সত্যি তোমার মায়ের ছেলে?”
রনি – ” হ্যাঁ, ভাইয়া। মিথ্যা হতে যাবে কেনো? দেখো না, আমাদের দুইজনের নামের কি মিল রাজু, রনি! যদি দুই ভাই না হতাম তাহলে আমাদের নাম হতো কবির, আবুল এই টাইপের কোনো কিছু। যাতে কোনো মিল নাই। বুঝেছো?”
রাজু – ” বুঝেছি, ভাইয়া।”
রনি – ” ভাইয়া, আমি তোমার ছোট ভাই তাই তুমি আমার নাম ধরে ডাকবে।  আর ভাইয়া বলবে না।”
রাজু কোনো উত্তর দিলো না।
রনি – ” চলো ভাইয়া আমরা হোম ওয়ার্ক করি, একসাথে।”
রাজু – ” চলো।”
দুইজন এক সাথে হোম ওয়ার্ক করলো। এক সাথে নাস্তা করে ঘুমোতে গেলো।
রফিম সাহেব একা একা বাসায় ফিরছেন। রাত ১১ টা বাজে। ১০ টায় ফিরার কথা। মন ভালো আছে কি? সে উত্তর তার নিজের মতো সবারই অজানা। বাবাদের মন খারাপ হতে নেই। প্রকৃতির ধরা বাধা নিয়ম। রাজু জন্যে তার ভিতরটা কষ্টে ফেটে যায়। কি অপরাধ ছিল এই নিষ্পাপ ছেলেটার? সাত-আট মাস কোলে নিয়েই কি বিরক্ত হয়ে যেতে হয়? একা ফেলে চলে গেলো পারভীন। প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই একটি মস্ত বড় ভুল সীদ্ধান্ত থাকে।  রফিক সাহেবের জীবনেও আছে। কিন্তু প্রত্যেকটা ভুল সীদ্ধান্তের পিছনে থাকে মহৎ একটি উদ্দেশ্য।
রফিক সাহেব বাসায় এসেই প্রথমে দুই ছেলের ঘরে গেলেন। আহা! কি সুন্দর করেই না দুই ভাই জড়াজড়ি করে ঘুমিয়েছে। কি মায়া তাদের! কিন্তু মাঝে মাঝে তার ভয় হয়। কারণ প্রত্যেকটা মায়ারই একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। তারপর আর মায়া বাড়ানো যায় না। মায়া কাজ করে না। পুরনো মায়াও ছিন্ন হয়ে যায়। তখন তো তার রাজু একা হয়ে যাবে।
রনি – ” ভাইয়া, উঠো আমরা নামাজ পড়বো। লেইট করলে আল্লাহ রাগ করবেন উঠো।”
রাজু উঠে গেলো। দুই ভাই নামাজ পড়লো, একটু পড়াশোনা করলো, স্কুলের জন্যে রেডি হলো। দুই ভাই বাবার সাথে নাস্তা করছে। মা করবে না। মায়ের অনেক গুলা কারণ আছে নাস্তা না করার পিছনে। তার মধ্যে একটি কারণ প্রকৃতি জানে। বাকিগুলি প্রকৃতির অজানা। সুখি হতে গেলে খুব বেশি মানুষ লাগে না। সুখের উপকরণ অল্প কিছু সুন্দর মনের মানুষ।
রনি – ” বাবা। জানো ভাইয়া গত কালকে পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে আজ পুরষ্কার দিবে।”
রফিক – ” তাই নাকি বাবা?”
রাজু  – ” জ্বী বাবা।”
রফিক – ” কি পরীক্ষা ছিলো, বাবা?”
রাজু – ” গণিত, বাবা।”
রফিক – ” ফার্স্ট হয়ে কেমন লেগেছিলো বাবা?”
রাজু – ” খুব ভালো। বলেছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। আর ভাইয়া খুব খুশি হয়েছিলো। “
রফিক – ” সুবাহান আল্লাহ! তোমায় কে শিখিয়ে বাবা আলহামদুলিল্লাহ বলতে?”
রাজু – ” ভাইয়া বলেছিলো, ভালো কিছু হলে সবসময় বলবে আলহামদুলিল্লাহ তাহলে আল্লাহ খুশি হবেন। আর আল্লাহ খুশি হলে নাকি কেউ আর আমাকে পাগল বলবে না।”
রফিক সাহেবের বুকে পাক দিতে শুরু করলো। নিজেকে শক্ত করে বললেন – ” বাহ, চমৎকার!  বাবা, রনি তো তোমার ছোট ওকে ভাইয়া বলবে না। ওকে নাম ধরে ডাকবে। ঠিক আছে?”
রাজু – ” ঠিক নেই বাবা। আমি ওকে ভাইয়া বলেই ডাকবো।”
রফিক – ” আচ্ছা ঠিক আছে।”
রফিক সাহেব অফিসে গেলেন। দুই ভাই স্কুলে গেলো। কেয়া কি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে তা বুঝা যাচ্ছে না।
মেডাম মাইকে ঘোষণা করে দিলেন গণিত পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে রাজু। রনি তার ভাই কে নিয়ে স্টেজ পর্যন্ত গেলো।  পুরষ্কার নিলো,  চলে আসলো। দু এক জন বলতে লাগলো-” পাগলটা পুরষ্কার পেলো কিভাবে?”
রনি – ” এই আমার ভাই পাগল না।  পাগল বলবে না। আমার ভাই ভালো।”
” পাগল রে তো পাগলই বলবো।”
রনি – “তুই পাগল। আমার ভাই পুরষ্কার পেয়েছে, তুই পাস নি।”
রাজু – ” ভাইয়া। ঝগড়া করো না। আমার ভয় করে। “
রনি – ” আজ ভাইয়ার জন্যে বেঁচে গেলি,  চলো ভাইয়া।”
আজ সন্ধা হয়ে গেলো অনুষ্ঠানের কারণে। দুইভাই একা একা হাটছে কিছু পাচ্ছে না যাওয়ার মতো। অবশ্যি একটি বাইক ড্রপ দিতে চেয়েছিলো ওদের পরিচিত।  রাজু ভয় পায় তাই যায় নি। শীতল বাতাস বইছে চারপাশে। শীতল বাতাসের খুব সুন্দর একটি বৈশিষ্ট আছে। তা হলো, না বলা কথা গুলো বলে দেয়।
রনির ভালো লাগছে। এই শীতল বাতাস তার খুব দরকার। তার জন্যে না,  ভাইয়ের জন্যে।
রনি লক্ষ্য করলো দুজন লোক তাদের ফলো করছে। সে অনেকটাই আঁচ করতে পারছে কি হতে চলেছে। কিন্তু ভাইয়াকে বুঝতে দিলে হবে না।
রনি – ” ভাইয়া।”
রাজু – ” বলো ভাইয়া।”
রনি – ” কেউ যদি তোমায় নাম জিজ্ঞেস করে কি বলবে?”
রাজু – ” তুমি যা শিখিয়ে দিয়েছিলে তাই বলবো। বলবো রনি।”
রনি – ” গুড ভাইয়া। আচ্ছা, বলতো আমাদের পরিবারে আমি, তুমি ছাড়া সবচেয়ে ভালো মানুষ কে?”
রাজু – ” মা মনে হয়, তাই না?”
রনি – ” কেনো বললে এমন?”
রাজু – ” একটি বইয়ে পড়েছিলাম ‘ভালো মনের অধিকাংশ মানুষই কঠোর হয়’ তাই বললাম। আর মা তো অনেক ভালো।”
রনি – ” শুনো ভাইয়া, কিছু কিছু খারাপ মনের মানুষও খুব কঠোর হয়। মা অধিকাংশ ভালো মনের মানুষের মধ্যে পড়েন না। উত্তর টা হলো, বাবা।”
রাজু – ” বাবা কে তো আমি প্রতিযোগিতায়ই নামাই নি আমি।”
দুই ভাই হাসছে। লোকগুলো তাদের কাছে চলে আসলো। নাম জিজ্ঞেস করলে রনি বললো তার নাম রাজু। তাই রাজু কে ছেড়ে দিলো। কিন্তু রাজু যায় নি। দাড়িয়ে কাঁদতেছে।  একটি গাড়ীতে উঠানো হলো রনি কে।
রনি – ” রনি (রাজু) ভাইয়া, তুমি যাও। আমার কিছু হবে না তুমি যাও। আমি ফিরে আসবো।  ভাইয়া প্লিজ তুমি বাসায় যাও।”
রাজু – ” না ভাইয়া আমি যাবো না। তোমার সাথে যাবো।”
গাড়ীটি চলে গেলো। রাজু কিছুক্ষণ কাঁদলো বসে বসে।  তারপর চলে গেলো। বাসায় গিয়ে তার মাকে সব বলায়, মা রাজুকে খুব মারলেন ভাইকে ফেলে আসার দ্বায়ে।
রফিক সাহেব কে কল করে বাসায় আনা হলো। রনি সেদিন আসে নি। সবাই কাঁদতে কাঁদতে ঘুমালো। শুধু একটি প্রাণি জেগে ছিলো। ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে বিচার দিলো। ভাই বলেছিলো কেউ কিছু করলে আল্লাহর কাছে বিচার দিতে হয় তাহলে সঠিক বিচার হয়। তাই সে দুষ্টু লোকগুলোর নামে বিচার দিলো। নামাজ শেষে দরজা খোলে বাইরে বসে রইলো।  বেশ কিছুক্ষণ বসার পর দেখলো রনি আসছে। ভাইকে দেখে রাজু খুব উৎসাহিত হলো। মা কে গিয়ে বললো ভাই এসেছে, ভাই এসেছে।
সবাই দৌড়ে এলো।
কেয়া – ” বাবা তোর কিছু হইনি তো? কইছিলি তুই রক্ত কেনো হাতে?  সারারাত আমার ঘুম হয়নি বাবা তোর চিন্তায়।”
রনি – ” তুমি যেমন তোমার ওই ছেলেকে চিনতে ভুল করো, তেমনি তোমার বাহিনীও তোমার এই ছেলেকে চিনতে ভুল করেছে। তুমি যদি দুই ছেলেকেই ঠিক মতো চিনতে তাহলে তোমার বাহিনী দুই ছেলেকে চিনতো! ও আমার ভাই।  আমি বেঁচে থাকতে ওর কিছুই হতে দিবো না।”
অভিশপ্ত চোখগুলো এমনি হয় অল্পতে পানি গড়ায় না। সীমার পরিসমাপ্তি ঘটলে তখনি পানি গড়ায়। কেয়া বুকে টেনে নিলো তার দুই ছেলেকে। রফিক সাহেবের খুব ভালো লাগছে। আর আড়ালে থেকেই খুব সাবধানে চোখটা মুছে নিলো একটি প্রাণি।
Share

Comments are closed.