,


সংবাদ শিরোনাম:

বড় যুদ্ধ এড়িয়ে জয়ের ইরানি কৌশল

বড় যুদ্ধ এড়িয়ে জয়ের ইরানি কৌশল

 

ইরানিরা তাদের বীর জেনারেলকে হত্যার জন্য ট্রাম্পকে যতই অভিশাপ দিক, একটা ধন্যবাদ ট্রাম্পের পাওনা। ট্রাম্পের কারণেই ইরাকের আরও নিকটজন হয়েছে ইরান। ইরাকে আমেরিকার বেশির ভাগ কাজই বুমেরাং হয়েছে। যেমন জর্জ বুশ ইরাক দখলে নিলেও দেশটির নেতৃত্ব চলে গেছে ইরানপন্থী শিয়া গোষ্ঠীগুলোর কাছে। এদিকে সুলেইমানিকে হত্যা করে তাঁর আরাধ্য কাজ সেরে দিচ্ছেন ট্রাম্প। বর্তমান ও বিগত তিন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যে শয়তান চক্রের (অ্যাক্সিস অব এভিল) ভয় মার্কিন নাগরিকদের দেখাতেন, সুলেইমানির মৃত্যুর বদলায় সেই চক্র এবার সত্যিই সংগঠিত হয়েছে। এক সারিতে আমেরিকার মুখোমুখি ইরান-ইরাক-সিরিয়া-হিজবুল্লাহ এবং তাদের অধীন অজস্র ছোট-বড় যোদ্ধা গোষ্ঠী। মরণেও সুলেইমানি তাঁর কাজ করে যাচ্ছেন। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মুখস্থ হুমকির বুলি এখন ইরাকের বিরুদ্ধে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। কারণ ইরানের হয়ে ইরাকও এখন তার দেশ থেকে মার্কিন সেনা সরানোর দাবিতে সোচ্চার। ইরাকের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের পর জার্মানি ইরাক থেকে কিছু সৈন্য ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে পুতিন সফর করছেন তুরস্ক, বসেছেন এরদোয়ানের সঙ্গে। তার আগে সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের খবর গণমাধ্যমে এসেছে।

মৃত্যুতেও সুলেইমানি সফল
সুলেইমানির হত্যার অভিঘাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে ইরাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকে দখলদারির আইনগত ভিত্তি যে চুক্তি, ইরাকি পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাতিলে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সরকারের জন্য এই আহ্বান যদিও বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু ঘটনাবলি সেদিকেই যাচ্ছে। অন্তত এই প্রস্তাব পাশের পর ইরাকে আমেরিকান সেনারা রাজনৈতিকভাবে অবৈধ হয়ে গেল। আইনগত অবৈধ ঘোষণার আগেই যদি কোনো ইরাকি আমেরিকানদের ওপর হামলা করে, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা রাজনৈতিক চাপের কারণেই কঠিন হবে। আর চুক্তি বাতিল হওয়া মাত্রই ইরাকের মাটিতে প্রতিটি আমেরিকান প্রাণ আক্রমণের বৈধ ও আকর্ষণীয় নিশানা বলে গণ্য হবে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও চমকপ্রদ। ইরাকের প্রভাশালী ধর্মীয় নেতা মুকতাদা আল সদর তাঁর সদর-সেনাদের আবার সক্রিয় করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ব্যক্তি ইরাকে বিপুল জনপ্রিয়। তাঁর হুকুমে চলে বিরাটসংখ্যক যুবকের এক বাহিনী। সুলেইমানির ইরাকি সহযোদ্ধা মোহানদিস নিহত হলেও মোহানদিসের মিলিশিয়া বাহিনী এখন সদর-সেনাদেরও পাশে পাবে। সুলেইমানি আরবজুড়ে যে মার্কিনবিরোধী সামরিক ও রাজনৈতিক জোট গঠনের কাজে অনেক দূর এগিয়েছিলেন, তাঁর লাশ সামনে রেখে সেই জোট আরও শক্তিশালীই হলো।

বিশ্বাসঘাতকতার শিকার সুলেইমানি

সবারই প্রশ্ন ছিল, সুলেইমানি কেন এ রকম প্রকাশ্যে ইরাকে চলাফেরা করছিলেন? এতই দুর্ধর্ষ যদি তাঁর নেটওয়ার্ক, তাহলে কেন বিপদের কোনো আভাসই ইরানিরা পায়নি? গুমরটা ফাঁস করেছেন ইরাকের তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী আদিল আবদুল-মাহদি। কোনো সামরিক নেতা হিসেবে নয়, সুলেইমানি ইরাকে এসেছিলেন কূটনৈতিক পাসপোর্টে, রাষ্ট্রীয় সফরে, সাধারণ বিমানে অতিথি হিসেবে। এসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে। ট্রাম্প ইরাকি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যাতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেন। সুলেইমানির জন্য সৌদি আরব সমঝোতার বার্তাও পাঠিয়েছিল। তাই তিনি সশরীরে বাগদাদে এসেছিলেন ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে। ঘটনাটা ঘটেছে অনেকটা সৌদি সাংবাদিক খাশোগি হত্যার কায়দায়। সৌদি আরব আলোচনার জন্য জামাল খাশোগিকে তুর্কি দূতাবাসে ডেকে এনে হত্যা করেছিল।

ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁকে হত্যা করে শান্তির এই চিকন সুতাটি ছিঁড়ে ফেলা হয়।

সুতরাং সুলেইমানি ছিলেন ইরানের সরকারি বার্তাবাহক। যুদ্ধ শাস্ত্রে এবং কূটনীতিতে চিরায়ত একটা নৈতিকতা হলো, বার্তাবাহককে হত্যা না করা। সুলেইমানিকে হত্যা করে আসলে শান্তির বার্তাকেই হত্যা করা হলো। ইরাক জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক আইনের এই ন্যক্কারজনক লঙ্ঘনের প্রতিবাদ জানাবে। তবে আমরা জানি, তাতে কিছুই হবে না।

ট্রাম্প যদি হত্যার নির্দেশই দেবেন তাহলে শান্তির উদ্যোগ কেন নিতে বললেন? নাকি সেটা ছিল এক পাতা ফাঁদ। নির্দেশ তিনিই দিন বা দিক রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র, বা ইসরায়েল—ইরানের সঙ্গে শান্তি তারা চায় না। আমেরিকার যে মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভরতা, ইরান তাকে কোনোভাবেই মানতে চায় না।

সৌদি তেল ও মার্কিন ডলারের অবিচ্ছেদ্য প্রণয়
মধ্যপ্রাচ্যের তেল শুধু আগুনই জ্বালায় না, তা শান্তিরও শত্রু। ওপরে ওপরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, দেশপ্রেম, গণতন্ত্র রপ্তানি ইত্যাদির আড়ালে প্রায়ই চাপা পড়ে যায় সব সমস্যার মূলের এই জিনিস। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে যুদ্ধের উসকানি চলে, তারও কারণ সেসব গণমাধ্যমের পেছনে ক্রিয়াশীল আন্তর্জাতিক তেল-লবির স্বার্থ। তারা কোনোভাবেই চাইতে পারে না মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসুক বা কোনো বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে সৌদিদের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা হোক।

তাই ট্রাম্প সাহেব ইমপিচমেন্ট থেকে দৃষ্টি সরাতে ইরান-যুদ্ধ চান; তা বোধ হয় সঠিক নয়। সুলেইমানিকে হত্যা করে যুদ্ধোন্মাদনায় চাপিয়ে নিজেকে পরের বারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট করার যে সমীকরণ টানা হয়, সেটা দৃশ্যমান কারণ হলেও মূল কার্যকারণ না। তেল আর ডলার হলো আমেরিকার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির দুই ডানা। এক ডানায় পাখি ওড়ে না। জটিল আলোচনার সংক্ষেপ: সৌদি আরবের মতোই আমেরিকার অর্থনীতি তেলনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দখলে থাকা তেলের খনিগুলি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত তেলের মূল্য ডলারে রূপান্তরিত করে আমেরিকান ট্রেজারিতে পাঠায়। আমেরিকা ডলারকে বিনিময় মুদ্রার বদলে পণ্যের মতো করে ব্যবহার করে। অন্যদিকে গোটা দুনিয়া তাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় মার্কিন ডলারের আকারে করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ ডলার ছাপানোয় যেহেতু তারাই একচেটিয়া, সেহেতু এই পণ্যের দাম তারা যেটা ঠিক করবে সেটাই মানতে হবে সবাইকে। আর দুনিয়ার সব দেশ ডলারে তাদের রিজার্ভ রাখে বলে, ডলারের চাহিদা সব সময় থাকে বলে, এর দরপতন খুব একটা মারাত্মক হয় না। আন্তর্জাতিক তেল-বাণিজ্য ডলারে করার ফলে ডলার সবাইকেই কিনতে হবে। চীনও করে, রাশিয়াও সেটা করে।

সূত্র: প্রথম আলো

Share

Comments are closed.